‘যতই শক্তিশালী হোক পুঁজিবাজারে কারসাজির দিন শেষ’

‘যতই শক্তিশালী হোক পুঁজিবাজারে কারসাজির দিন শেষ’

স্বর্ণের ভ‌রি বেড়ে ৭৬ হাজার ৩৪১ টাকা
বাগেরহাটে এক ইলিশের দাম ৫৩০০ টাকা !
১৫ নভেম্বর থেকে ফের ‘রেল পানি’ বিক্রি

যে যতোই শক্তিশালী হোক, পুঁজিবাজারে কারসাজি করে আর পার পাওয়া যাবে না হুঁশিয়ার করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। তিনি বলেছেন, পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিয়ে পালানোর দিন শেষ। এখানে যারা আগে, বিভিন্নভাবে অনিয়ম যুক্ত ছিলেন, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেয়ারবাজার বিষয়ক এক ওয়েবিনারে শনিবার বিএসইসি চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন (বিএমবিএ) এবং ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিষ্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে।

অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম জানান, পুঁজিবাজারের ব্যবসা সহজ করার জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার বিএসইসির পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে, সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘পুঁজিবাজার থেকে অনিয়ম এবং বিভিন্ন কারসাজি দুর করতে ডিএসইর তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগে সংস্কার জুররি। ডিএসইর ওয়েবসাইট নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিলো তার জন্য গঠিত তদন্ত কমিটি রিপোর্ট চূড়ান্ত করেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিতে বলবো।’

শেয়ারবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিএসইসি বেশকিছু উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে উল্লেখ করে অধ্যাপক শিবলী বলেন, ‘এককভাবে ২ শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই এমন কোম্পানির ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। অনেক বোর্ড ভেঙেও দেয়া হতে পারে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র পরিচালকদের কার্যক্রম কঠোরভাবে পর্যবেক্ষন করা হবে। এছাড়া সম্প্রতি জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাজারকে আরও বড় করতে হবে, যাতে তিন থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দৈনিক লেনদেন হয়।’

বিএসইসির চেয়ারম্যান মনে করেন, পুঁজিবাজারে শতভাগ সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে, মানুষ এখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবে না। মানুষের পুঁিজর নিরাপত্তা দিতে না পারলে, তারা কষ্টার্জিত অর্থ শেয়ারবাজারে নিয়ে আসবে কেন সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।

আর এর জন্য সবার আগে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়ার পর কিছু কোম্পানি ঠিক মতো কাজ করছে না। হঠাৎ কোম্পানি করে তারপর বন্ধ করে চলে যাচ্ছে। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করেছেন। সেসব কোম্পানিতে প্রয়োজনে বোর্ডও ভেঙ্গে দিয়ে আমরা স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করবো। আইনের মধ্যে থেকেই এগুলো করা হবে। তা না হলে শেয়ার বাইব্যাক (পুণঃক্রয়) করে নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’

বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, শেয়ারবাজারে বৈচিত্র আনতে হবে। এই বাজারটাকে অনেক বড় করতে হবে। তারমতে, বর্তমানে প্রতিদিন ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই লেনদেনকে দ্রুত ৩ থেকে ৫ হাজার কোটিতে নেয়ার জন্য কাজ করতে হবে। এজন্য সারাদেশে ব্রোকারেজ হাউজের শাখা ছড়িয়ে দিতে হবে। এমনকি দেশের বাইরেও ডিজিটাল আউটলেট করার ব্যাপারে চিন্তা করা হচ্ছে।

অধ্যাপক শিবলী বলেন, ‘ইক্যুইটিভিত্তিক শেয়ারবাজার থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছি। গত সাড়ে ৩ মাসে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সাব-অর্ডিনেটে এবং পার্পিচুয়াল বন্ড এবং ৮৫০ কোটি টাকার জিরো কূপন বন্ডের অনুমোদন দিয়েছি। এতে বাজারের সব কিছু বৃদ্ধি পাবে।’

কিছু দুষ্ট লোক নিয়মনীতি না মেনে অপকর্মে লিপ্ত হলে তাদের জন্য ২ থেকে ৫ শতাংশের জন্য সাধারন বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্থ হতে দেয়া হবে না বলে সবাইকে আশ্বস্ত করতে চান বিএসইসি চেয়ারম্যান।

এ ব্যাপারে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার তাগিদ দিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘যাতে কাউকে ক্ষতি করে বা চালাকি করে টাকাপয়সা নিয়ে যেতে না পারে। স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়ে আগামীতে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে জানান তিনি। আইনে কাভার করলে কিছু স্বতন্ত্র পরিচালককে সরিয়ে দিতে হতে পারে। তাদের জায়গায় সঠিক স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়া হবে। এই স্বতন্ত্র পরিচালকদেরকে যে উদ্দেশ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটা এখনো পূরন হয়নি। আমরা এই সপ্তাহে স্বতন্ত্র পরিচালকদের অনলাইনে আবেদন নেয়া শুরু করব। যারা যোগ্য হবেন, তাদেরকে নেয়া হবে।’

সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) প্রসঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির যে কাজ, সেটা তারা সঠিকভাবে করতে পারছে না। এ কারণে সরকারের নির্দেশে আইসিবিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের পর আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে আইসিবি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তখন সরকার থেকে আইসিবিকে আরও তহবিল দেয়া হবে। তার মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আইসিবির যে ভুমিকা, সেটা রাখতে পারবে।’

‘আর্থিকখাতে শিক্ষিত জনগৌষ্ঠীর অবদান কম’

ওয়েবিনারে ডিএসইর চেয়ারম্যান মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সামাজিক উন্নয়নে বিশে^র রোল মডেল অথচ পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতে তার উল্টো চিত্র। আর্থিকখাতে যেটুকু উন্নতি করেছে তাও প্রান্তিক জনগনের দ্বারা হয়েছে। এখানে শিক্ষিত জনগোষ্ঠির কোনো অবদান নেই বললেই চলে।’

মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, ‘নতুন কমিশন আসার পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে এতে দীর্ঘ মেয়াদে তেমন আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। আর মেয়াদে উন্নতি করতে হলে সুশাসন জরুরি। টেকসই পুঁজিবাজার করতে হলে এখানে স্বচ্ছতা দরকার।’

আর এর জন্য বিএসইসি, ডিএসই, সিএসইসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করার প্রস্তাব করেন তিনি। কমিটি বাজারসংশ্লিষ্ট নতুন সিদ্ধান্ত বা নীতিমালা তৈরি করাসহ নানাভাবে ভুমিকা রাখবে।

‘গত ১০ বছরে আস্থার সংকট ছিল’

পুঁজিবাজারে গত ১০ বছরে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল মন্তব্য করে ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, ‘এ কারণে বিনিয়োগকারীরা বার বার প্রতারিত হয়েছেন। বাজারে টাকার কোনো সমস্যা ছিল না, কিন্তু আস্থার সঙ্কট ছিল। গত ১০ বছরে যে কোম্পানিগুলোর আইপিও এসেছে সেগুলো অত্যন্ত মানহীন। এসব আইপিওর ক্ষেত্রে যেসব ইস্যু ম্যানেজার, আন্ডার রাইটার, অডিটর যারা মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন তাদের পুঁজিবাজার থেকে অন্তত তিন বছর দূরে রাখতে হবে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানির শেয়ার এবং অপ্রদর্শিত অর্থ বাজারে আনার বিষয়ে জোর দিতে হবে।’

অন্যদের মধ্যে সিএমজেএফের সভাপতি হাসান ইমাম রুবেল, বিএমবিএ সভাপতি ছায়েদুর রহমান, ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, ডিএসইর সদস্য আহমেদ রশীদ লালী এবং বিএমবিএর সাধারণ সম্পাদক মো. রিয়াদ মতিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

COMMENTS

[gs-fb-comments]