বুক বিল্ডিংয়ে কার লাভ?

বুক বিল্ডিংয়ে কার লাভ?

চাকরির পেছনে না ছুটে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করুন: প্রধানমন্ত্রী
১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর ২২ দিন ইলিশ ধরা-বিক্রি নিষিদ্ধ
এবার সর্বোচ্চ পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) আসা ভালো কোম্পানির প্রিমিয়াম নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে চালু হয় বুক বিল্ডিং পদ্ধতি। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এই পদ্ধতি চালু হলেও এটি এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। কয়েক দফা সংশোধন হলেও বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা বয়ে আনতে পারছে না, উল্টো ঠকছেন তারা।

অভিযোগ উঠেছে, পুঁজিবাজার থেকে অসাধু চক্রের অর্থ লোপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বুক বিল্ডিং। কোম্পানি ও ইস্যু ম্যানেজারের যোগসাজশে এক শ্রেণির যোগ্য বিনিয়োগকারী বুক বিল্ডিং পদ্ধতির বিডিংয়ে অংশ নিয়ে শেয়ারের উচ্চ কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণ করছেন। ফলে কোম্পানি পাচ্ছে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম। অন্যদিকে, উচ্চ দামে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর, কোম্পানি সেই দাম ধরে রাখতে পারছে না।

এমন পরিস্থিতিতে ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিও বুক বিল্ডিং নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। পাবলিক ইস্যু রুল অনুযায়ী, শুধু ফিক্সড প্রাইসে (স্থির মূল্যে) বা ফেসভ্যালুতে পুঁজিবাজারে আসতে হলে একটি কোম্পানিকে পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ১০ শতাংশ অথবা ৩০ কোটি টাকা, এর মধ্যে যেটি বেশি সেই পরিমাণ শেয়ার ছাড়তে হয়। অর্থাৎ ফেসভ্যালুতে পুঁজিবাজারে আসতে একটি কোম্পানিকে কমপক্ষে তার ১০ শতাংশ শেয়ার আইপিওতে ছাড়তে হয়।

অপরদিকে প্রিমিয়াম নিতে হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসতে হয়। এ ক্ষেত্রে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা বিডিংয়ে অংশ নিয়ে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করেন। তবে এই বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোম্পানিকে কমপক্ষে কত শতাংশ শেয়ার ছাড়তে হবে তার কোনো নীতিমালা নেই। কাট-অফ প্রাইসের ওপর নির্ভর করে শেয়ার ছাড়ার পরিমাণ।

এমন নিয়মের কারণে বিডিংয়ে নির্ধারিত কাট-অফ প্রাইসের ওপর নির্ভর করে ওয়ালটন আইপিওতে এক শতাংশেরও কম শেয়ার ছেড়েছে। এত অল্প সংখ্যক শেয়ার আইপিওতে আসায় ইতোমধ্যে কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে এক ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে হু-হু করে বাড়ছে দাম। তালিকাভুক্তির পর এক সপ্তাহ পার না হতেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিনগুণ।

শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থির মূল্য বা বুক বিল্ডিং যে পদ্ধতিতেই কোম্পানি আইপিওতে আসুক, কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার নিয়ম করা উচিত। এটা না করা হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঠকবেন। কারণ বাজারে শেয়ার কম থাকলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা সম্ভব। যা ক্ষতিগ্রস্ত করে সার্বিক বাজার।

তারা বলছেন, আইপিওতে ‍ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার নিয়মের পাশাপাশি বিডিংয়ে অংশ নিয়ে যোগ্য যেসব বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ দাম হাঁকছেন, বিএসইসির উচিত তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া, কিসের ভিত্তিতে তারা এমন দাম হাঁকছেন। যদি কোনো যোগ্য বিনিয়োগকারী যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে না পারেন তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

 

এদিকে, বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বাতিলের দাবি তুলেছেন। তাদের দাবি, বুক বিল্ডিং বাতিল করে শুধু ফিক্সড প্রাইজ পদ্ধতিতে আইপিও অনুমোদন দিতে হবে। এ দাবির পক্ষে যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতির দুর্বলতার কারণে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ, ইস্যু ম্যানেজার ও কতিপয় দুর্নীতিবাজ যোগ্য বিনিয়োগকারী পরস্পর যোগসাজশে শেয়ারের দর অতি মূল্যায়িত করে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। বিএসইসি যেটা কোনোভাবেই রোধ করতে পারছে না।

অভিযোগ আছে, ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে মহাধসের আগে অর্থাৎ ২০০৯ সালে এই বুক বিল্ডিং পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটেছিল অসাধু চক্র। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টেও উঠে আসে, ধসের অন্যতম কারণ ছিল এই বুক বিল্ডিং। ফলে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই সময় বুক বিল্ডিং কার্যক্রম বন্ধ করা হয়।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে বন্ধ হওয়া বুক বিল্ডিং পদ্ধতি ২০১৬ সালে আবারও নতুন করে চালু করে বিএসইসি। তবে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। ফলে কয়েক দফা পরিবর্তন হয় পদ্ধতিটির। এরপরও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। বিডিংয়ে শেয়ারের উচ্চ মূল্য নির্ধারিত হলেও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির পর সেই দাম ধরে রাখতে পারছে না।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিডিংয়ে কাট-অফ প্রাইস ৮৫ টাকা নির্ধারণ হওয়া একমি ল্যাবরেটরিজের শেয়ারের দাম এখন (১ অক্টোবর) ৭২ টাকা ৪০ পয়সা। কাট-অফ প্রাইস ৬০ টাকা নির্ধারণ হওয়া আমান কটন ফাইবারের শেয়ারের দাম এখন ৩০ টাকা ২০ পয়সা। ৮০ টাকা কাট-অফ প্রাইসের বসুন্ধরা পেপারের শেয়ারের দাম এখন ৪৬ টাকা ৫০ পয়সা। কাট-অফ প্রাইস ৭৫ টাকা নির্ধারণ হওয়া রানার অটোমোবাইলসের শেয়ারের দাম এখন ৫৭ টাকা ১০ পয়সা। ৪৫ টাকা কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণ হওয়া এস্কয়ার নিট কম্পোজিটের শেয়ারের দাম এখন ৩১ টাকা ২০ পয়সা। অবশ্য কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম মাঝে আরও কমে যায়।

শেয়ারের দাম কাট-অফ প্রাইসের নিচে নেমে যাওয়া কোম্পানিগুলোর চিত্র-

কোম্পানির নাম

কাট-অফ প্রাইস

সর্বনিম্ন দাম

বর্তমান দাম (১ অক্টোবর ২০২০)

একমি ল্যাবরেটরিজ

৮৫ টাকা

৫৪.২০ টাকা

৭২.৪০ টাকা

আমরা নেটওয়ার্কস

৩৯ টাকা

২৮.৩০ টাকা

৪২.৯০ টাকা

আমান কটন ফাইবার

৬০ টাকা

১৬ টাকা

৩০.২০ টাকা

বসুন্ধরা পেপার

৮০ টাকা

৩৫ টাকা

৪৬.৫০ টাকা

এস্কয়ার নিট কম্পোজিট

৪৫ টাকা

১৮.৩০ টাকা

৩১.২০ টাকা

রানার অটোমোবাইলস

৭৫ টাকা

৩৯ টাকা

৫৭.১০ টাকা

এডিএন টেলিকম

৩০ টাকা

২৬.৮০ টাকা

৩৮.৪০ টাকা

এদিকে, আমরা নেটওয়ার্কস, আমান কটন, বসুন্ধরা পেপার, এস্কয়ার নিট কম্পোজিট ও রানার অটোমোবাইলসের বিডিং প্রক্রিয়ায় পরস্পর যোগসাজশ, কারসাজি, দুর্নীতি ও অনিয়ম করা হয়েছে বলে বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, এসব কোম্পানির কারণে পুঁজিবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে, পুঁজিবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক জাগো নিউজকে বলেন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কাট-অফ প্রাইজ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিডিং প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট অনিয়ম হয়েছে। এখানে ইস্যু ম্যানেজাররা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। বিডিং প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ইস্যু ম্যানেজারের সহায়তায় কোম্পানির কর্তৃপক্ষ ও কতিপয় দুর্নীতিবাজ ইলিজিবল ইনভেস্টররা (যোগ্য বিনিয়োগকারী) পরস্পরের যোগসাজশের মাধ্যমে শেয়ারের উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করেন। বিএসইসি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে সংশোধনী আনলেও এই অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করতে পারেনি। শেয়ারের দর অতিমূল্যায়িত হওয়ায় কোম্পানিগুলো লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিঃস্ব হন লাখ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী। তাই বুক বিল্ডিং পদ্ধতি তুলে দিয়ে শুধু ফিক্সড প্রাইসে আইপিও দেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

যোগাযোগ করা হলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. বখতিয়ার হাসান জাগো নিউজকে বলন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসা কোম্পানির শেয়ারের দাম তালিকাভুক্তির পর কাট-অফ প্রাইসের নিচে নেমে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। বিডিংয়ে অংশ নিয়ে যেসব যোগ্য বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ দাম প্রস্তাব করছেন, বিএসইসির উচিত তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া। কিসের ভিত্তিতে তারা দাম প্রস্তাব করছেন, যদি কেউ ইনটেনশনালি (ইচ্ছাকৃতভাবে) অতিরিক্ত দাম প্রস্তাব করেন তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।

 

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওতে আসা ওয়ালটনের এক শতাংশের কম শেয়ার ছাড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, ‘আইপিওতে এত অল্প শেয়ার ছাড়া মানে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়া, এটা স্বাভাবিক। এতে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যা সার্বিক বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমি মনে করি, বুক বিল্ডিং অথবা ফিক্সড প্রাইস, যে পদ্ধতিতেই কোম্পানি আইপিওতে আসুক, কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার বিধান করা উচিত।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করে বলেন, অল্প শেয়ার হওয়ায় ওয়ালটনের শেয়ারের দাম হু-হু করে বাড়ছে। কোম্পানিটির শেয়ারের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, কেউ জানেন না। বাজারে শেয়ারের যে চাহিদা, সরবরাহ তার থেকে অনেক কম।

‘বাজারে কোম্পানিটির যে শেয়ার আছে, ক্রয়ের আদেশ পড়ছে তার থেকে বেশি। শেয়ারবাজারে আগে কখনও এমন চিত্র দেখা যায়নি। এত অল্প শেয়ার আইপিওতে ছাড়ার সুযোগ দেয়া উচিত হয়নি। বিএসইসির উচিত অতিদ্রুত বুক বিল্ডিং পদ্ধতি সংশোধন করা। এ পদ্ধতিতে এমন বিধান রাখতে হবে যে, আইপিওতে আসতে হলে কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে-ই হবে।’

COMMENTS

[gs-fb-comments]