রঙ ফর্সার ক্রিমে পুড়ছে নারীদের ত্বক

রঙ ফর্সার ক্রিমে পুড়ছে নারীদের ত্বক

নিজের মাথায় নিজেই গু’লি করলেন পুলিশ কর্মকর্তা
মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াচ্ছে বাংলাদেশ
কে এই রেজা আমিন যাকে বিয়ে করলেন শমী কায়সার

প্রসাধন চর্চায় নারীদের ব্যবহৃত রঙ ফর্সাকারী ক্রিমে মিলেছে উচ্চমাত্রার ক্ষতিকর পারদ ও হাইড্রোকুইনোন। বাজার থেকে ১৩টি ক্রিম সংগ্রহ করে পরীক্ষায় আটটিতেই পাওয়া গেছে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই দুই উপাদান। এসব ক্রিম ব্যবহারের কারণে ত্বকের উপরিভাগের ক্ষতির পাশাপাশি স্বাভাবিকতাও হারিয়ে যাচ্ছে চিরতরে।

খোলা বাজার ও অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম ‘দারাজ’ থেকে ১৩টি ব্র্যান্ডের রঙ ফর্সাকারী ক্রিম সংগ্রহ করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। ক্রিমগুলো হলো গৌরী, চাঁদনী, নিউ ফেইস, ডিউ, গোল্ডেন পার্ল, ফাইজা, নূর, হোয়াইট পার্ল প্লাস। ল্যাবরেটরিতে ক্রিমগুলোর মান পরীক্ষা করা হয়। এসব ক্রিমের মধ্যে ছয়টিতে বিপজ্জনক মাত্রায় মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পারদ ও দুটি ব্র্যান্ডের ক্রিমে পারদ এবং হাইড্রোকুইনোন উভয়ই পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ মান (বিডিএস ১৩৮২:২০১৯) অনুযায়ী এ ধরনের ক্রিমে পারদের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা ১ পিপিএম এবং হাইড্রোকুইনোনের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা ৫ পিপিএম। মাত্রাতিরিক্ত পারদ ও হাইড্রোকুইনোনযুক্ত এসব ক্রিম দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে চর্মরোগসহ বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ত্বক ফর্সা করতে নারীদের প্রসাধনের তালিকায় থাকে নানা কিসিমের রঙ ফর্সাকারী ক্রিম। গেল বছর রং ফর্সাকারী এসব ক্রিম ব্যবহারে নজিরবিহীন সতর্কতা জারি করে যুক্তরাজ্য। যেকোনো মূল্যে এ ধরনের পণ্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বানও জানায় দেশটির লোকাল গভর্নমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এলজিএ)।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে খুচরা ব্যবসায়ী থেকে অনলাইন শপে এসব ক্রিম নির্বিচারে বিক্রি চলছে। আড়াইশ থেকে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত এক কোটা ক্রিম বিক্রি করা হচ্ছে।

বিএসটিআইর পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের রং ফর্সকারী ১৩টি ক্রিমের মধ্যে ছয়টিতে ক্রিমে বিপজ্জনক মাত্রায় মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পারদ (মার্কারি) ও দুটি ব্র্যান্ডের ক্রিমে পারদ (মার্কারি) এবং হাইড্রোকুইনোন উভয়ই পাওয়া গিয়েছে। ক্ষতিকর পারদ পাওয়া এসব পণ্য সবগুলোই পাকিস্তানের।

এসব ক্রিম বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বিএসটিআই। স্কিন ক্রিমের বাংলাদেশ মান (বিডিএস ১৩৮২: ২০১৯)-এ মার্কারির গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা ১ পিপিএম। আর হাইড্রোকুইনোনের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা ৫ পিপিএম। তবে এসব ক্রিমে পারদের যে মাত্রা মিলেছে তা নির্ধারিত মানের থেকে প্রায় সাড়ে ৯০০ গুণ বেশি। তাই এখনই এসবের ব্যবহার বন্ধ না করলে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বেন ব্যবহারকারীরা।

বিএসটিআইয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বড় বড় সুপার শপগুলোতে এসব ক্রিম না পাওয়া গেলেও বিউটি পার্লার, সেলুন ও মহল্লার দোকানে এসব বিক্রি হয়। মহল্লার দোকান থেকেই বেশি ক্রিম সংগ্রহ করা হয়েছে। আবার অনলাইনেও এসব ক্রিম প্রত্যন্ত এলাকার নারীরা কিনে থাকেন। এটা আতঙ্কের খবর।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইড্রোকুইনোন এমন এক রাসায়নিক যা জৈবিক রং পরিবর্তনের এক ধরনের উপাদান বা ‘পেইন্ট স্ট্রিপার’। এই রাসায়নিক মানুষের ত্বকের একটি স্তরকে অপসারণ করে দিতে পারে। এর ফলে ত্বকের ক্যান্সার, যকৃত এবং কিডনির মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। পারদ থেকেও একই ধরনের প্রাণঘাতী স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা থাকে। আর ক্ষতিকর মাত্রায় এই দুটি উপাদান থাকা এসব ক্রিম ব্যবহারের কারণে ভোক্তারা নিজেদের অজান্তেই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন।

পারদ ব্যবহার করা অবশ্যই ক্ষতিকর জানিয়ে আর তা ব্যবহার যদি অতিমাত্রায় তাহলে সেটার পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে সতর্ক করেছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ চৌধুরী।

অতিমাত্রায় পারদ ব্যবহারের ফলে কোন ধরনের ক্ষতি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘পারদ একটি বিষাক্ত ধাতু। এটা কোথাও ব্যবহার হলে ক্ষতি আছে। আর সেটা যদি হয় অতিমাত্রায় তাহলে ক্ষতির পরিমাণও বেশি হবে। তাই যতটা সম্ভব পারদ ব্যবহার না করাই ভালো।’

ডার্মাটোলজিস্টদের মতে, পারদ এমনিতেই শরীরের জন্য সুবিধাজনক নয়। আর হাইড্রোকুইনোনে কিডনি, লিভারের সমস্যা এমন কি ক্যান্সারেরও ঝুঁকি আছে। হাইড্রোকুনোন হলো ‘পেইন্ট স্ট্রিপার’। এটা ত্বকের ওপর কৃত্রিম প্রলেপ তৈরি করে। এর কুফল তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে।

কোন ক্রিমে কি মিলেছে?

বিএসটিআই তাদের পরীক্ষায় পাকিস্তানের পাকিস্তানের গৌরী কসমেটিকস (প্রা.) লিমিটেডের গৌরী (Goree) ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে মার্কারির মাত্রা ৭৫৫.৮৫ পিপিএম। দেশটির এস. জে এন্টারপ্রাইজের চাঁদনী (Chandni) ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে মার্কারির মাত্রা ৬২৯.৯৬ পিপিএম।

কিউ. সি ইন্টারন্যাশনাল এর নিউ ফেস (New Face) ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে মার্কারির মাত্রা ৫৯০.৩৮ পিপিএম। দেশটির ক্রিয়েটিভ কসমেটিকস (প্রা.) লিমিটেডের ডিউ (Due) ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে মার্কারির মাত্রা ২৮৫.৮৮ পিপিএম।

একই দেশের গোল্ডেন পার্ল কসমেটিক্স প্রাইভেট লিমিটেডের গোল্ডেন পার্ল (Golden Pearl) ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে মার্কারির মাত্রা ৬৫৪.১৩ পিপিএম। আর পুনিয়া ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেডের ফাইজা (Faiza) ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে মার্কারির মাত্রা ৫৯০.৪৫ পিপিএম।

নুর গোল্ড কসমেটিকসের নুর (Noor) ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে মার্কারির মাত্রা ১৯৩.৬৮ পিপিএম ও হাইড্রোকুইনোনের মাত্রা ১৯৮০.৬৮ পিপিএম এবং পাকিস্তানের হোয়াইট পার্ল কসমেটিকসের হোয়াইট পার্ল প্লাস (White Pearl Plus) ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে মার্কারির মাত্রা ৯৪৮.৯৩ পিপিএম ও হাইড্রোকুইনোনের মাত্রা ৪৩৪.৭৩ পিপিএম পাওয়া গিয়েছে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক কে এম হানিফ ঢাকা টাইমসকে বলেন, এই ক্রিমগুলোতে যে পরিমাণ পারদ মিলেছে তা বিপজ্জনকের মাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি। প্রতিবেদনের কপি সারা দেশে জেলা প্রশাসকদের কার্যালয়ে, এনবিআরসহ সব জায়গায় পাঠানো হবে। দেশজুড়ে অভিযান চালানো হবে। কোথাও পাওয়া গেলে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেও যদি গ্রাহকরা বর্জন করা শুরু করেন তাহলে এমনিতেই এসব ক্ষতিকর পণ্য বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

COMMENTS

[gs-fb-comments]